আজ ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

কিশোরগঞ্জে এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণে কেটে খাওয়া মানুষের মরণদশা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কিশোরগঞ্জে এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসার বেড়াজালে গ্রামগঞ্জের নারী-পুরুষ।দেশে কতসংখ্যক এনজিও আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান বলা খুবই দুঃসাধ্য এনজিওগুলোর নেই কোন নিয়োগ বিধিমালা, নেই বদলি নীতিমালা ও নেই নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির নিশ্চয়তা ও চাকরি শেষে আর্থিক নিরাপত্তা। এনজিওর ঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশই ঋণের দায়ে অতিষ্ঠ। ঋণগ্রহীতারা এ জাল থেকে বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু এনজিওগুলির কৌশলী তৎপরতায় তারা কোনভাবেই এ জাল থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।

গরিবদের স্বাবলম্বীর নামে বিদেশী টাকায় শত শত এনজিও মাকড়সার জালের মতো সারাদেশের নেয় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় ক্ষুদ্রঋণের জাল ছড়িয়ে দিয়েছে এনজিওগুলো।এ ঋণের জালে আটকে গেছে লাখো অসহায় নারী-পুরুষ।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা মারিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন ঋণ গ্রহীতা জানান, কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই, ছেলেমেয়ে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়। তারপরও কিস্তির জন্য চাপ তো আছেই।

যার ফলে এনজিও’র মাঠকর্মীদের দেখলেই ঋণগ্রহীতারা বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হয়।সদর উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়নের সব-কয়টা গ্রামের অভিন্ন চিত্র বলে যায়।
গ্রামীণ, ব্রাক,আশা এনজিও ব্যাংকসহ স্হানীয় পর্যায়ের ছোট বড় এনজিও ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এনজিও জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নের নামে ক্ষুদ্রঋণ দানের চটকদার ব্যবসায় নেমে পড়েছে।

নারী স্বাবলম্বী এবং আত্ম কর্মসংস্থানের নামে এনজিওগুলো গ্রামের মানুষের মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে। চড়া সূদে সে ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তির যোগান দিতে গিয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ছে ঋণ গ্রহীতারা।

কাইয়ুম নামে বিন্নাটি বাজারের এক ক্ষুদ্র চা ব্যবসায়ী জানান, যেকোনো ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ সবকিছুতেই এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে ঋণ দেয়া হয়।সে ঋণের সূদ নেয়া হয় শতকরা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে এমন এনজিওর সন্ধানও পাওয়া গেছে যারা শতভাগও সূদ আদায় করছে। তাদের আদায়ের পদ্ধতিও অদ্ভূত।
যারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যই যেন হয়ে গেছে কিস্তি পরিশোধ করা। বছরের পর বছর কিস্তি দিয়েও ঋণগ্রহীতারা ঋণের জাল থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।

স্বাবলম্বী হওয়া তো দূরের কথা ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে ভিটা-মাটি, ঘটি-বাটি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী বিক্রি করতে হচ্ছে। ঋণের কিস্তির যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটেছে। ঋণের কিস্তি নিয়ে বিরোধে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামের ঋণ গ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক গ্রামীণ,আশা,ব্রাক ব্যাংকসহ কয়েকটি এনজিও ঋণ নেয়ার পরের সপ্তাহ থেকে কিস্তি আদায় শুরু করে। আর ঋণের টাকা যোগাড় করতে না পারলে ঋণগ্রহীতাকে ঘরের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, ঘটি-বাটি বিক্রি করে সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। যখন তাতেও কুলায় না তখন ভিটা-মাটি ও ঘর বিক্রি করে এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। এ বীভৎসতায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

বেসরকারী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালের ২৭ আগস্ট হতে ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬ (২০০৬ সালের ৩২নং আইন) কার্যকর করেন। এই আইনের আওতায় ক্ষুদ্রঋণ সেক্টরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে সরকার ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি (এমআরএ)’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ক্ষুদ্রঋণ সেক্টরকে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনয়নের লক্ষ্যে উল্লিখিত আইনের প্রয়োগ এবং ইহার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য অথরিটিকে ক্ষমতায়ন এবং দায়বদ্ধ করা হয়। তাতেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি যত্রতত্র অনুমোদন ছাড়ায় এনজিওর মতো প্রতিষ্ঠান জন্ম নিচ্ছে যা দেশও জাতির জন্য অসহনীয় সংকেত। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকার কুটুর হস্তে প্রদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন বিশিষ্ট জনেরা।

এনজিওর এই তৎপরতায় সরকার ও প্রশাসন একেবারেই নির্বিকার।নির্বোধ জনসাধারণের হাহাকারে কারোরই এ বিষয়ে সামান্য কোন মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায়নি বলে জানান সুশীল সমাজ।

মানব চেতনা/এমআর

Facebook Comments Box

Comments are closed.

     More News Of This Category