আজ ৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

করোনাকালের সাংবাদিকতায় নতুন অভিজ্ঞতা

-আমিনুল হক সাদী :    সাংবাদিকতা সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। সত্য কথা লিখতে গিয়ে সাংবাদিকদের বন্ধুও শত্রুতে পরিণত হয়। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সাংবাদিকদেরকে করোনাভাইরাসের মহামারি সেই চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।

সেটি শুধু হাসপাতালসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কারণে সাংবাদিকের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিই নয়, বরং এ রকম ক্রান্তিকালে যে ধরনের সাংবাদিকতা কাঙিত, তা হয়নি। বিশেষ করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকারি ভাষ্যের বাইরে গিয়ে সাংবাদিকের নিজস্ব অনুসন্ধানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত নানারকম গুজব ও প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে যেভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল, প্রচারমাধ্যম সেটি কতটা পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। করোনাভাইরাসে আয় কমে গেছে এই অজুহাতে অনেক সংবাদমাধ্যম থেকে অসংখ্য কর্মী ছাঁটাই হয়েছেন। অনেক মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের বেতন ঝুলে গেছে। করোনাকালের ঈদের বোনাসও পাননি অনেকে।

ফলে নিজের চাকরি ও মজুরি নিয়েই যখন অনিশ্চয়তা, তখন সেই সাংবাদিকদের কাছ থেকে কতটা বস্তনিষ্ঠ, সাহসী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করা যায়? অন্যের অধিকার নিয়ে সর্বদা সোচ্চার থাকা এই মিডিয়াকর্মীদের অধিকার নিয়ে অন্য কোনো পেশার মানুষ কখনো ভাবে না বা তাদের ভাববার অবকাশও নেই। যেকোনো পেশার মানুষ বিপদে পড়লে প্রথম ফোনটা একজন পরিচিত সাংবাদিককে করেন, অথচ সেই সাংবাদিকের যখন চাকরি থাকে না বা বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন সেই সাংবাদিকের সামনে একজন সিনিয়র সহকর্মী কিংবা কোনো সাংবাদিক সংগঠনের সাথে আলাপ করা ছাড়া ওই অর্থে কোনো পথ খোলা থাকে না।

ফলে বছরের পর বছর ধরে একদিকে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ এবং অন্যদিকে চাকরির অনিশ্চয়তার ভেতরে থাকেন যে পেশার মানুষ, তারা করোনাভাইরাসের মতো একটি আন্তর্জাতিক সমস্যাকালে কতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে পারবেন- যেখানে করোনাভাইরাসের ইস্যু নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যেও ক্ষমতার খেলা চলে- তা বলাই বাহুল্য। করোনাকালে যে ধরনের সাংবাদিকতা মানুষ প্রত্যাশা করেছে বা করছে, সেটির পথে প্রধান অন্তরায় ছিল মৃত্যুভীতি। অন্যান্য বড় ঘটনার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা যেমন ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত থেকে সত্য বের করে আনার চেষ্টা করেছেন বা করেন, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব হয়নি আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুঝুঁকির কারণে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনেকেই ঘটনাস্থল যেমন হাসপাতাল, মর্গ ও কবরস্থানে গিয়ে সংবাদ কাভার করলেও সব প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের জন্য এটি অনুমোদন দেয়নি। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকের প্রধান শক্তি যে সূত্র বা সোর্স, করোনাভাইরাসের কারণে সেসব সোর্সের কাছেও সাংবাদিকদের পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

সরকারি অফিস মাসের পর মাস বন্ধ থেকেছে; খুললেও সেখানে কর্মী উপস্থিতি ছিল কম। ফলে সাংবাদিকদের পক্ষে সরকারি ভাষ্যের বাইরে গিয়ে নিজস্ব অনুসন্ধানে রিপোর্ট করার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। যারা সুযোগ পেয়েছেন তারা করেছেন ও এখনো করছেন। তা সত্ত্বেও যেহেতু প্রচারমাধ্যম এখন এক ধরনের বড় অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আরো নানাবিধ সংকটের ভেতর দিয়েই তাকে যেতে হচ্ছিল। ফলে নিজেদের বিবিধ সংকট, ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে কাহিল দেশের মূলধারার সব মিডিয়ার পক্ষেও কাক্ষিত সাংবাদিকতা করা যে সম্ভব হয়নি, তা আশা করি কেউ অস্বীকার করবেন না।

করোনাভাইরাস বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে হামলা ও মামলার নামে সাংবাদিকদের হয়রানির শিকার হওয়ারও অনেক ঘটনা ঘটেছে। ত্রাণ চুরি ও প্রশাসনের সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশ ও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য কতক সাংবাদিকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাও হয়েছে। করোনাকালের সাংবাদিকতাঠর সময়ে প্রতিবেদক দু কন্যা সন্তানের জনক হয়েছি। করোনা ঝুঁকির মাথায় নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যেতে হয়েছে বাচ্চাদের নানা অসুখ বিসুখের চিকিৎসা কাজে। সে সময়ে হাসপাতালেও ভালো আচরণ করেনি দায়িত্বশীলরা।

বিশেষ করে তারা দায়সারাভাবে কোন রকম রুগীকে দেখে না দেখেই রেফার করেছেন এমন অভিযোগ শুনতে হয়েছে। কর্তব্যরতরা রুগীর দায়িত্ব নিতে গরিমসিও করেছেন। তবে সাংবাদিক হওয়ার কারনে নিজেদের রুগীকে কাঙিত সেবা পেয়েছেন। করোনা সচেতনতায় পিপি পরিধান করে কাজ করাটা ছিলো কঠিন। তবুও করোনা থেকে রক্ষার জন্য তা পরিধানও হয়েছে।

এই পিপি পরতে গিয়ে আবার নানা বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়েছে। আমরা যেহেতু মফস্বলের সংবাদ কর্মী তাই কাজশেষে অনেক রাত করে বাসা বাড়িতে ফিরতে হতো। রাতে যখন সব কাজ করে বাসায় যেতাম তখন এমন নিকশ কালো রাতে রাস্তায় জনমানব খুব একটা দেখা যেত না। যানবাহনও ছিলো গুটি কয়েক,সীমিত পরিসরে তাও রিকশা। রিকশা দিয়ে চলাচল ভাড়াও দিতে হতো ডাবল। একদিন অফিসের কাজ সেরে রাতে বাসায় ফিরছিলাম। শহর থেকে অনেকটা দুরেই আমাদের বাড়ি। করোনার সময়ে গ্রামের মানুষ খুব একটা সতর্কতা অবলম্বন করেনি। ফলে খোলাখোলিভাবেই চলতে দেখেছি গ্রামবাসীকে। প্রতিদিনের ন্যায় যখন রাতে বাড়ি ফিরছিলাম তখন গ্রামের মানুষগুলি আমাকে পিপি পরিধান দেখে খুব ভয় পেয়েছিলো।

কারণ রাতে সাদা পোষাক পরে বের হলে গ্রামবাসী ভাবে এই বুঝি ভূত পিশাচ ভর করছে আজ। সারা শরীর ঢাকা হাতে মৌজা মুখে মাস্কে বাঁধা মাথামন্ডল। ধবধবে সাদা পিপি পরিহিত দেখে ভয় পাওয়াটা গ্রামের মানুষের কাছে স্বাভাবিক। যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চরাচল করতাম সে পথের মানুষ আমাকে দেখে এত ভয় পাবে কল্পনাও করতে পারিনি। তাই পরদিন থেকে পিপি পরিধান করা ছেড়ে দেই। পিপি পরিধান ছাড়া অফিসে গেলে সহকর্মীরাও আতংকে থাকতো। সন্দেহের নজর মনে মনে যদি তার করোনা হয়। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সংবাদ পরিবেশন করতে হয়েছে। পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকদেরকে করোনাকালের সহায়তার খবর দেখেছি অনেক তবে আমাদের জেলায় গুটি কয়েকজন ছাড়া এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে অনেকেই।

সাংবাদিকতা কোনো কিছুর পাওয়ার জন্য নহে দুর্যোগ মুহুর্তে মানুষের পাশে থাকাটাই ছিলো একজন সাংবাদিকের মূলাদর্শ। আর তাই চেষ্টা করেছি দিন রাত কঠিন পরিস্থিতিতেও সংবাদ লেখনি চালিয়ে যেতে। বড় কোনো মিডিয়ায় কাজ করতে না পারলেও বড় দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আর পরিবার পরিজন ও হিতাকাঙিদের কঠোর নিষেধ থাকা সত্বেও সংবাদ পরিবেশন করেছি। কারণ মানুষ থাকিয়ে থাকতো আমাদের প্রতি কি সংবাদ লিখছি। প্রতিদিন রাতে খবর শুনার জন্য অপেক্ষা করতো।

কখন কোন খবর আপডেট দিচ্ছি। করোনায় কতজন মারা গেছে কতজন কোন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছে সেসব জানার জন্য অসংখ্য ফোন পেতাম। সেই শুভাকাঙীদের জন্য হলেও সংবাদ পরিবেশন করে যেতে হয়েছে। যে মিডিয়ায় কাজ করতাম সেটির মাসিক সম্মানী বন্ধ হয়েছে তবে আমাদের সংবাদ সংগ্রহের কাজ বন্ধ হয়নি।

কঠোর সময়ে কঠিন মুহুর্তে সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেছি।

আমিনুল হক সাদী
সাংবাদিক ও লেখক

মানব চেতনা/এমআর

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category