আজ ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মেসির ক্লাব ছাড়ার আগাগোড়া নেপথ্যের কাহিনী

অনলাইন ডেস্ক: একটি ব্যুরোফ্যাক্স পাঠিয়েছেন তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে, জানিয়েছেন ক্লাব ছাড়তে চান। ব্যস, এটুকুই। তিনি নিজে সরাসরি কোনো কথা বলেননি। সংবাদমাধ্যমের জিজ্ঞাসায় ফ্যাক্স পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে এফসি বার্সেলোনা। এর বেশি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নেই তাদেরও। পর্দার পেছনে ঘটা দু’পক্ষের ফ্যাক্সবার্তা বিনিময়ের সূত্র ধরে তোলপাড় ওঠে গোটা ফুটবল দুনিয়ায়। পাঁচ মাস ধরে বিশ্বজুড়ে অনলাইনে-অফলাইনে আলোচনার শীর্ষে যে ‘করোনাভাইরাস’, সেটিও কয়েক ঘণ্টার জন্য গুগল সার্চে পেছনে পড়ে গেল। দু’দিন বাদেও লিওনেল মেসির বার্সা-বিচ্ছেদ ইস্যু এখন ‘টক অব দ্য ফুটবল’; ক্ষণে ক্ষণে রং বদলের মাধ্যমে যা এক মস্ত ধাঁধাও। কোথায় যাচ্ছেন তিনি, কে বলছে কী, কে কষছে কোন অঙ্ক- এ নিয়ে যেন গোলকধাঁধায় ফুটবলবিশ্ব।

বার্সা ছাড়তে চাওয়ার কারণ জানাবেন

গত মঙ্গলবার ব্যুরোফ্যাক্সে বার্সাকে ক্লাব ছাড়ার কথা জানানোর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনা। কেন ছাড়ছেন, কোথায় যাবেন, যেতে পারবেন কিনা। এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন মাধ্যম নানাভাবে ব্যাখ্যা করলেও বার্সা কিংবা লিওনেল মেসির পক্ষ থেকে এখনও মেলেনি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য। তবে দেরিতে হলেও এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। বৃহস্পতিবার তেমনি খবর জানিয়েছে ‘গোল ডটকম’। প্রতিবেদনে মেসির কথা বলার সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না করলেও শিগগিরই যে এ ব্যাপারে মেসির মন্তব্য জানা যাবে, সেটি এক প্রকার নিশ্চিতই করেছে খেলাধুলাবিষয়ক বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই সাইট। এদিকে মেসি চলে গেলে গ্রিজম্যানই নাকি কোম্যান প্রজেক্টের নেতা বনে যাবেন। এমনটা জানিয়েছে স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কা।

দৌড়ে এগিয়ে ম্যানসিটি

মঙ্গলবার ব্যুরোফ্যাক্সে বার্সাকে ক্লাব ছাড়ার বার্তা দেওয়ার পর পরই ম্যানচেস্টার সিটি দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। মেসিকে পেতে তারা রীতিমতো মরিয়া। প্রথম দিন চুপ থাকলেও এখন আর বসে নেই পিএসজি ও ইন্টার। তারাও খুব করে চাচ্ছে মেসিকে দলে টানতে। মার্কার খবর এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে মাঝে এগিয়ে আবার সিটিজেনরা। মেসি নিজেও নাকি সিটিতে যেতে ইচ্ছুক।

আইনি ঝামেলা এড়াতে বার্সার অনুশীলনে নামবেন

‘চলে যাচ্ছি’ বলে ‘চলে গেলাম’ নয়, লিওনেল মেসি বার্সেলোনাকে বলেছেন, ‘আমি চলে যেতে চাই।’ মেসি-বার্সেলোনার মধ্যে যে চুক্তি, সেটি একতরফা। কর্তৃত্ব যেখানে ক্লাবের। এখন বার্সেলোনা যদি তাকে না ছাড়তে চায় আর মেসিও যদি ক্লাব ছাড়ার বিষয়ে অনড় থাকেন, তাহলে আইনি মীমাংসা ছাড়া উপায় নেই। আর সম্ভাব্য ওই আইনি লড়াইয়ে যেন নতুন ইস্যু না ওঠে, সেজন্য সোমবার বার্সেলোনার অনুশীলনে যোগ দেবেন মেসি। আর্জেন্টাইন চ্যানেল টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, চুক্তি চলমান অবস্থায় কেন দলের কার্যক্রমে অংশ নেননি- এমন কোনো প্রশ্ন তৈরির সুযোগ দিতে চান না মেসি। তার আইনজীবীরা তাই পরামর্শ দিয়েছেন, বার্সেলোনা ত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে মীমাংসা হওয়ার আগ পর্যন্ত যেন ক্লাবের কার্যক্রমে অংশ নেন। ২০২০-২১ মৌসুমের প্রস্তুতিতে বার্সেলোনা অনুশীলনে নামবে আগামী সোমবার। ওই দিনই নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যান দল দেখভাল শুরু করবেন। তার আগের দিন সব খেলোয়াড়কে করোনা পরীক্ষা দিতে হবে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, রোববার পিসিআর টেস্টে নমুনা দেবেন মেসি। পরদিন যাবেন দলের অনুশীলন মাঠে। তবে একা অনুশীলন করবেন নাকি দলের বাকিদের সঙ্গে করবেন, সেটি ঠিক করবেন কোম্যান। মেসির আইনজীবীরা মনে করছেন, ২০১৯-২০ মৌসুম আগস্টের শেষ সপ্তাহে শেষ হওয়ায় তার দল ছাড়ার জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। তবে বার্সেলোনা মনে করছে ৩০ জুনেই দলত্যাগ প্রক্রিয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। দুই পক্ষের ভিন্নধর্মী এ বক্তব্যই হতে পারে আদালতের বিচার্য বিষয়।

কত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বার্সার

মার্কার খবর মেসি চলে গেলে কেবল তার বেতন, বোনাস ও ভাতাবাবদই ১২০ মিলিয়ন ইউরো অর্থ সাশ্রয় হবে না, ট্রান্সফার ফি থেকেও বড় অর্থ আয়ের সুযোগ আছে। তার রিলিজ ক্লজ ধরা আছে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো। মেসি চান ফ্রি এজেন্ট হিসেবে যেতে। কিন্তু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বার্সেলোনা তাকে কোনো অর্থ ছাড়া ছাড়বে বলে মনেও হয় না। ফ্রি এজেন্ট হিসেবে ছাড়লেও অবশ্য রিলিজ ক্লজ ক্যাটাগরিতে অর্থ আদায়ের সুযোগ আছে কাতালান ক্লাবটির।

জার্সি বেচেই ২০০ মিলিয়ন তুলবে সিটি

মানি ইজ নো প্রবলেম- ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে অন্তত এই কথাটা যায়। সাবেক ডিফেন্ডার ড্যানি মাইলসও সে কথা মনে করিয়ে দিলেন। মেসিকে আনতে অর্থ নিয়ে খুব একটা ভাবতে হবে না সিটিজেনদের। জার্সি বেচলেই নাকি ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড উঠে যাবে তাদের। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমি মনে করি না অর্থ এখন সিটির জন্য বড় কোনো ইস্যু। যদি জার্সি বিক্রি করা হয় তাহলে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড তোলা যাবে।’ স্প্যানিশ মাধ্যমগুলোর খবর, নিজের পেশাদারিত্বের খাতিরে আগামী কয়েকটা দিন বার্সার অনুশীলনে নামলেও এর মাঝে চুক্তির বাকি কাজটা সেরে ফেলবেন মেসি। সেজন্য ফিফাকেও জানিয়ে রেখেছেন, যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে যেতে দেওয়া হয়।

কথা বলতে মেসির বাবা ইংল্যান্ডে

আরএসিওয়ান এবং টিওয়াইসি স্পোর্টসের খবর- ছেলের নতুন ক্লাব চূড়ান্তকরণের কাজে জর্জ মেসি ম্যানচেস্টারে পৌঁছে গেছেন। এ মুহূর্তে লিওনেল মেসির বাবার ম্যানচেস্টার যাওয়ার অর্থ একটাই- ম্যানসিটির সঙ্গে ট্রান্সফারের বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ। ইংলিশ লিগে মেসির সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ম্যানইউ এবং চেলসির নাম উচ্চারিত হলেও ম্যানচেস্টার সিটিই সবার চেয়ে এগিয়ে।

দুই বন্ধুর ডিনার পার্টি

বুধবার বিকেলে বার্সার একটি হোটেলে দেখা যায় মেসি-সুয়ারেজকে। ডেইলি মেইল বলছে, ডিনার পার্টিতে নিজেদের দলবদল নিয়েও কথা হয়। গুঞ্জন রয়েছে, মেসির বার্সা ছাড়ার পেছনে নাকি সুয়ারেজকে বাদ দেওয়াও একটা কারণ। এদিকে সুয়ারেজের এজেন্ট বলছেন, মেসির ভবিষ্যতের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে সুয়ারেজের সামনের পথ। কেননা মেসি বার্সা ছাড়ার পর সুয়ারেজকেও খুঁজতে হবে নতুন ঠিকানা। শোনা যাচ্ছে, এক ক্লাবেও যেতে পারেন দু’জন।

এত বেতন দিতে পারবে না পিএসজি

কিলিয়ান এমবাপ্পে আর নেইমার দু’জনে যা বেতন পান লিওনেল মেসিকে তার চেয়ে বেশি বেতন দিতে হবে। এই কথা চিন্তা করেই পিএসজি যেন দৌড় বন্ধ করে দিল। ফরাসি দৈনিক ‘এল ইকুইপ’ তাদের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, করোনার এই ক্রান্তিকালে মেসিকে যদি ফ্রিতেও পায় পিএসজি, তবু নাকি এই সামারে আনতে পারবে না। এখন নেইমারকে প্রতিবছর পিএসজি দেয় ৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড, আর এমবাপ্পেকে দেওয়া হয় ১৯ মিলিয়ন পাউন্ড। দু’জনের অর্থ এক করলে হবে ৫২ মিলিয়ন পাউন্ড। সেখানে মেসিকে আনলে প্রতিবছর পিএসজিকে আরও বাড়তি ৬৪ মিলিয়ন পাউন্ড গুনতে হবে। যেটা তাদের জন্য নাকি একেবারে অসম্ভব।

জমা ছিল অনেক দিনের ক্ষোভ

২০১২ :ভিয়ার সঙ্গে ঝামেলা

সতীর্থের সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক ছিল লিওনেল মেসির। কিন্তু ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎই খবর আসে স্প্যানিশ তারকা ডেভিড ভিয়ার সঙ্গে ঝামেলা মেসির। ঝামেলাটা হলো উইংয়ে খেলা নিয়ে। কয়েক মাস ধরে দু’জনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ ছিল। পরের বছরই বার্সেলোনা ছেড়ে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন ভিয়া।

২০১৩ :রোনালদোর বেশি বেতন

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনার সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করেন লিওনেল মেসি। প্রতিবছর তার বেতন ধরা হয়েছিল ১২ মিলিয়ন ইউরো। কয়েক মাস পরই বছরে ১৭ মিলিয়ন ইউরো বেতন ধরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে চুক্তি করেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। মেসি বেতন বাড়ানোর কথা বললেও বার্সেলোনা ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি।

২০১৫ :এনরিকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে কোচ লুইস এনরিকের সঙ্গে সম্পর্কের বেশ অবনতি হয় লিওনেল মেসির। ‘ড্রেসিংরুমে সবকিছু মেসি করেন’ এমন অভিযোগ করেছিলেন এনরিকে। রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে মেসিকে একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এরই মধ্যে গুজব ওঠে, চেলসিতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন তারকা। শেষ পর্যন্ত বার্সাতেই থেকে যান তিনি।

২০১৭ :আলোচনায় নানা জটিলতা

আগের চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসা বার্সেলোনার কর্তারা টালবাহানা করতে থাকেন। সেই ক্লাবের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সাল পর্যন্ত চুক্তি করেছিলেন মেসি।

২০২০ :আবিদালের কথায় ক্ষুব্ধ

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনা স্পোর্টিং ডিরেক্টর এরিক আবিদাল বলেছিলেন, কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দেকে বরখাস্ত করার জন্য খেলোয়াড়রা চাপ দিয়েছিলেন। আবিদালের এই কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে যান মেসি।

নেইমারও যোগ দেবেন মেসির সঙ্গে!

ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, মেসি একাই সিটিতে যাচ্ছেন না, ন্যু ক্যাম্পের সাবেক সতীর্থ নেইমারকেও নিয়ে যাবেন! ইএসপিএনের প্রতিবেদনে এসেছে, ব্রাজিলের ধারাভাষ্যকার হোর্হে নিকোলা জানিয়েছেন এমন খবরটি। মেসি নাকি নেইমারকে তার ইত্তিহাদে যাওয়ার খবরটি অবহিত করেছেন এবং পিএসজি ছেড়ে নেইমারকে ম্যানসিটিতে আসার বুদ্ধিও দিয়েছেন মেসি। তথ্যসূত্র: সমকাল

মানব চেতনা/এমআর 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category